Home জেলা উপজেলা স্বরুপে ফিরে আসুক সুর্বণচর

স্বরুপে ফিরে আসুক সুর্বণচর

166

আব্দুল বারী বাবলু: প্রায় শতবছর পূর্বে মেঘনার শতমোহনার মিলনে জন্ম হয়েছিল সুবজের চাঁদরে ঢাকা এক শান্তি প্রিয় স্বর্গের এ জনপদ । এখানে প্রকৃতি ও জীবন মিলে মিশে গড়ে তুলেছিল আত্মময়ী ও গর্বিত সামাজিক সহবস্থান। এ অঞ্চলের মানুষ বরাবরের মতই পরিশ্রমী ও সংগ্রামী। এখানকার পলিবেষ্টিত ভূমিতে পরিশ্রম করে কৃষক ফলায় মূল্যবান কৃষ্টি আর প্রকৃতির সাথে সংগ্রাম করে স্বপ্ন দেখে বেঁচে থাকার।

সময়ের ব্যবধানে আজ বেঁচে থাকা আর সংগ্রামের চিত্র প্রায় বদলে যাবে এটা হয়তো কেউই ভাবতে পারেনি। তখন মানুষ সামাজিক মূল্যবোধ, শিক্ষিত হওয়া আর পরিশ্রম করে অর্থনৈতিক মুক্তি ও নিজের প্রজন্মকে মানুষ করার চিন্তায় ছিল বিভোর। প্রতিদিন কাকডাকা ভোরে শোনা যেত জীবিকার সন্ধানের খেটে খাওয়া মানুষের পদধ্বনি আর সন্ধ্যা হলে ঘরে ফেরা। রাতে হাটবাজারে চলতো গাবাসানো নিদারুন আড্ডা। আড্ডার ছলে একে অন্যের খোঁজখবর নেওয়া আপ্পায়ন আলাপন করা ছিল সামাজিকতার এক ভিন্ন চিত্র। একে অন্যের সুখে দু:খে ছিল সহযাত্রী। রাজনীতি কিংবা কোন প্রভাব তাদের মধ্যে সামাজিক সম্পর্ককে আলাদা করতে পারেনি।

৭০এর দশকে মহাপ্রলনকারী ঘুর্ণিঝড়ে এ অঞ্চলের লক্ষাধিক মানুষের সলিল সমাধী ঘটলেও তাদের সামাজিক মূল্যবোধের সমাধী হয়নি আবার ঘুরে দাড়িয়েছিল। তখন বছর জুড়ে শোনা যেত না কোন খুন হওয়া সন্তানের জন্য মায়ের আহাজারী অথবা কোন ধর্ষিতা মা বোনের আতর্œচিৎকার। কারণ তাদের মধ্যে সামাজিক মূল্যবোধ ও পারিবারিক শিক্ষা ছিল সুদৃঢ়। তখন অসামাজিক কোন কাজকে সমাজ কোন ভাবেই অনুমোদন করতো না। অপরাধ শুধু অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা হতো। কেউই প্রকাশ্যে অপরাধীকে প্রশ্রয় দেওয়ার সাহস করতো না বলেই এ অঞ্চল ছিল স্বর্গের মতো। ছিল শান্তিপ্রিয় এক সামাজিক পরস্পরবান্ধব জনপদ।

কয়েক যুগ পেরিয়ে আজ আধুনিকতার চোঁয়ায় অবাধ তথ্যপ্রবাহের সময়ে সামাজিক মূল্যবোধ,সহানুভূতি, পরস্পরবান্ধবতা ও মানবিকতা যেন বড়ই অধরা। প্রভাব-প্রবৃদ্ধি, অপরাধীকে দায়মুক্তি, অসামাজিকতা, রাজনৈতিক প্রশ্রয়, র্দুবৃত্তায়ন, পারিবারিক শিক্ষার অনুপস্থিতি, লাগামহীন র্দুনীতি, মেধাহীন ও সুশিক্ষাবিমূখতার কারনে এ অঞ্চলে শোনা যাচ্ছে গনর্ধষনের শিকার অসহায় মা বোনের আত্মচিৎকার, খুন,দখল, র্দুবৃত্তায়ন ও অসামাজিক কর্মকান্ড। যা সুবর্ণচরবাসী কখনও ভাবতেই পারেনি। একটা সময় ছিল যখন সমাজের একটি অংশের মানুষকে বেঁচে থাকার তাগিদে বাধ্য হয়ে ছিচকে চুরি, ডাকাতির মত অসামাজিক কাজ করতে হতো। তখন তাদের সামাজিক ভাবে প্রশয় দেওয়া হতো না বরং গনপিটুনিতে চোর ও ডাকাতরা মারা যেত। তাই এখন সমাজের সবত্রই সবার মুখে মুখে আলোচনা হচ্ছে এমন ঘটনাগুলো কেন ঘটছে এবং প্রশ্ন রাখছে এ অবস্থা থেকে আমাদের মুক্তির উপায় কি ?

উল্লেখ্য ৯৫ দশকের শুরুর দিক থেকে এ অঞ্চলে বিভিন্ন সময়ে প্রভাবশালীদের আশ্রয় প্রশ্রয়ে বার বার ঘটতে থাকে নানা সন্ত্রাসী কর্মকান্ড। বিশেষ করে উপজেলার চরাঞ্চলে বনদুস্যু ও জলদস্যুদের উত্থান ভাবিয়ে তুলেছিল সুবর্ণচরবাসীকে। সামাজিক ও গনমাধ্যমের ব্যাপক ভূমিকার ফলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহন করা হলেও অনেক প্রভাবশালীদের আশ্রয়ে প্রশ্রয়ে কিছু কিছু বনদস্যু ও জলদস্যুরা সামাজিক স¦ীকৃতি পেয়ে যায়। কেউ কেউ জোর করে জনপ্রতিনিধিও নির্বাচিত হয়েছে। আশ্রয় দিয়ে বনদস্যুদের যখন সমাজ শাসনের মতো গুরুত্বপূর্ন দায়িত্ব তুলে দেওয়া হয় সেখানে গনধর্ষন, খুন, দখল, দূর্বৃত্তায়ন ও অসামাজিক কর্মকান্ডের গতি বেগবান হবেই।

বর্তমান সমাজের ধর্ষক, সন্ত্রাসি, দখলবাজ, চাঁদাবাজ, র্দুবৃত্তকারীরা অন্যকোন জেলা বা উপজেলা থেকে আমদানি করা কোন বস্তু নয়,এরা আমাদের সমাজেরই অংশ। মূলত এরা সমাজে নিরবতার মত অপরাধবোধের অর্জিত সম্পদের কুফল আর আমাদের দেউলিয়া নেতৃত্বের ফসল। এই সব অপরাধীরা তৈরি হচ্ছে মুলত দুই ভাবে- পারিবারিক সুশাসনের অভাব আর রাজনীতির মাঠ দখলের জন্য লালনের মানসিকতা থেকে। যা আগামী প্রজন্মকে মানুষ হওয়ার পরিবর্তে দিন দিন অমানুষ হিসেবেই গড়ে তুলছে। তারা ভালবাসা দিয়ে জয় করতে নয় ভয় দেখিয়ে আদায় করতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন কিন্তু সমাজ আজও ভাল মানুষের চেহারা প্রদর্শনের রাজনীতিতে বিশ্বাসী।

এই অসামাজিক সন্ত্রাসীদের মুল স্বীকার হচ্ছে সাধারণ মানুষ। যারা কেবল মাত্র বেঁচে থাকার জন্যই নিত্য সংগ্রামে লিপ্ত। সাধারণ মানুষদের মধ্যে আবার নেই কোন সামাজিক বন্ধন। আর এই বিচ্ছিন্ন জীবন যাপনের সুযোগটিই লুপেনেয় সন্ত্রাসীরা। কারণ অপরাধীরা জানে এর প্রতিবাদ হবে না। কেউ তাদের সমাজচ্যুত করতে পারবে না। তাই তাদের ভয়ের কোন কারণ নেই। সামাজিক বিচারের মাধ্যমটা দুর্বল হয়ে পড়ায় মানুষের নিরাপত্তা আজ হুমকির মুখে। ফলে সামাজিক বিচারের নামে হচ্ছে প্রহসন, পক্ষপাতিত্ব ও রাজনৈতিক পরিচয়।

আজ সমাজে ধর্ষণের বিচার হচ্ছে,ধর্ষকের সাথে ধর্ষিতার বিয়ে অথবা টাকা দিয়ে সকলের মুখবন্ধ। অপরাধীরা জানে এ চেয়েবেশি কিছু হবেনা। যদিও কিছু হয় তাও আবার ঐ থানা পুলিশে সিমাবদ্ধ। সেক্ষেত্রে আবার আছে বড় ভাই ও প্রভাবশালীদের আশীর্বাদ তো রয়েছে।

সার্বিক সামাজিক চিত্র যখন এমন তখন সাধারণ মানুষ এদের দমনের জন্য রাষ্ট্রের দিকেই যে তাকিয়ে থাকবে তাতে আর সন্দেহ কি? কিন্তু রাষ্ট্র যন্ত্রের পক্ষে একা যে সব সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়, আমরা কেউ বুঝতেই চাই না। ফলে তিলে তিলে এই এ অঞ্চল হয়ে উঠছে অপ্রতিরোধ্য। এদের মুলউৎপাটন করতে শুধুমাত্র রাষ্ট্রের ঘাড়ে সব ভার না চাপিয়ে সকলকেই উদ্যোগী হতে হবে। সমাজে সার্বিক ভাবে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে এদের বিরুদ্ধে।

আমাদের মনে রাখা প্রয়োজন অপরাধী অন্য কেউ নয় সে আপনার আমার পরিবারের বিকিয়ে যাওয়া সন্তান। তাকে সাভাবিক জীবনের নিশ্চয়তা দেওয়ার দায়িত্ব আপনার আমার। তাকে প্রশয় দিয়ে সমাজের তার নিজের ক্ষতি করতে দেওয়াটাও অপরাধ। আজ আমার আপনার বিকিয়ে যাওয়া সন্তানের জন্যই স্কুল পড়ুয়া শিক্ষার্থী থেকে গৃহবধূরা নিরাপত্তাহিনতায় ভুগছে।

লক্ষ্যনীয় হলো, আজ আমার বা আপনার সন্তান বেঁচে গেছেও কাল তারাও একইভাবে আক্রান্ত হতে পারে। আজ কেন যেন আমাদের মধ্যে সামাজিক দায়বদ্ধতা তৈরি হচ্ছে না। জেগে উঠছে না মানবতা বোধ। আমরা যে যার স্থান থেকে নিজেকে বাঁচাতে ব্যস্ত হয়ে উঠছি প্রতিনিয়ত। একজন মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে, কিন্তু তার প্রতিবেশী ফিরেও তাকাচ্ছে না! আধুনিকতা যাতাকলে প্রতিদিন সৃষ্টি হচ্ছে একক পরিবারের নামে বিচ্ছিন্ন জগতের স্বার্থপর বাসিন্দা। এ স্বার্থপরতা আমাদের প্রতিদিন অমানুষ করে তুলছে। ফলে পাশাপাশি দুই বাড়ির বাসিন্দাদের মধ্যে কোন যোগাযোগ নেই। এক বাড়িতে শোকের ছায়া অন্য বাড়িতে বিবাহ বার্ষিকী অথবা জন্মদিনের বিলাসী কেট কাটার নোংরা উল্যাস।

তাই শুধু সুর্বণচর নয়,দেশে প্রতিটি সামজে সামাজিক মূল্যবোধ,পারিবারিক শিক্ষা, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় দায়বদ্ধতা,সচ্ছতা, জবাবদিহিতা, যোগ্য ও মেধাবী নেতৃত্ব, গড়ে তুলতে পারলে প্রতিটি পরিবার ও সমাজ হবে সুন্দর ও কলংক মুক্ত। অতএব প্রত্যেকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে সমাজ সংস্কারে এগিয়ে আসলেই সংঙ্কামুক্ত হবে আগামীর প্রজন্ম।

Facebook Comments