Home অাইন আদালত সুবর্ণচরে চাঞ্চল্যকর ধর্ষনের ইন্ধনদাতা রুহুল আমিনের উত্থান যেভাবে

সুবর্ণচরে চাঞ্চল্যকর ধর্ষনের ইন্ধনদাতা রুহুল আমিনের উত্থান যেভাবে

92
SHARE

আব্দুল বারী বাবলু: নোয়াখালীর সুবর্ণচর উপজেলার চরজুবিলী ইউনিয়নের গ্রামীন জনপদে রুহুল আমিন এক আতংকের নাম। রামগতির চরাঞ্চলের একসময়ের ভয়ানক লাঠিয়াল খুরশিদ আলম এর ছেলে এই রুহুল আমিন। তার বাবা ছিল একজন ধুরন্ধর লাঠিয়াল ও ব্যাগা চরের বেচু হত্যা মামলার মূল আসামি। ১৯৮০ দশকে নোয়াখালী ও লক্ষ্মীপুর জেলার সীমানা বিরোধে বেচু খুন হয়েছিল।

জানা যায়, রুহুল আমিন এর বাবা হত্যা মামলার আসামি হওয়ার পর, পরিবার অর্থনৈতিক ভাবে অসহায় হয়ে পড়লে, সে হারিছ চৌধুরী বাজারে রাহিন- মাহিন হোটেলে বয় এর কাজ নেয়। সেখানে কিছুদিন কাজ করার পর, রুহুল আমিন জেলা শহর মাইজদীর মোবারক মিয়ার বাসায় কাজ করত। কাজ করার সুবাদে ঐ বাসার পাশের নোয়াখালী ইউনিয়ন হাইস্কুলে পড়ালেখা করে এসএসসি পাশ করে। সেখান থেকে সুবর্ণচর উপজেলার পাংখার বাজারে সততা নামে একটি স্থানীয় এনজিওতে চাকুরী নেয়। ওই এনজিও থেকে ৭০ হাজার টাকা চুরি করে ঢাকা চলে যায়। ঢাকার কাওরান বাজারে পাইকারী সবজি দোকানে কাজ নেয়। সেখান থেকেও বেশ মোটা অংকের আতœসাত করে আত্মগোপনে বরিশাল চলে যান।

পরে মোবারক মিয়ার ছোট ভাই এডভোকেট আতাউর রহমান নাছের এর সহায়তায় সে জেলা জজকোর্টে আইনজীবি সহকারী হিসেবে কাজ শুরু করে। এ সুবাদে রুহুল আমিন এলাকার লোকজনের সাথে সখ্যতা গড়ে তোলে ও তার আধিপত্য বিস্তার করতে থাকে। সেখান থেকে ২০০৯ সালে আওয়ামীলীগে যোগ দিয়ে ওয়ার্ড সম্পাদকের দায়িত্ব পান। ২০১১ সালের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে ৫ নং চরজুবিলী ইউনিয়নের ৪ নং ওয়ার্ডের ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য নির্বাচিত হন। পরবর্তীতে তাকে সুবর্ণচর উপজেলা আওয়ামীলীগের প্রচার সম্পাদক করা হয়। ইউপি সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পূর্ব সময় পর্যন্ত তিনি ছিলেন একজন সাধারণ ভূমিহীন।

২০১১ সালে ইউপি সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর রুহুল আমিন তার বাবার মত এলাকায় বিভিন্নভাবে অপরাধের রাজত্ব সৃষ্টি করে। সে বনদস্যু ও জলদস্যুদের সংগঠিত করে রুহুল আমিন বাহিনী নামে নিজস্ব বাহিনী গড়ে তুলে। তার বাহিনী দেখ ভাল করত বনদস্যু হাসান আলী রুলু। ২০১১-১৬ সাল পর্যন্ত তার সময়ে এই জনপদে ত্রাসের রাজত্ব কয়েম করায় ফের ২০১৬ সালের ইউপি নির্বাচনে এলাকার জনরোষে পড়ে প্রতিদ্বন্দ্বি প্রার্থী খলিল উল্যার সাথে নির্বাচনে হেরে যান। সদস্য না হলেও সদস্যের দাপট দেখিয়ে তার অপকর্ম অব্যহত রাখে সে।

সরেজমিনে দেখা যায়, হারিছ চৌধুরী বাজার- রামগতি সড়কের পাংখার বাজার থেকে প্রায় ১ কি.মি. পশ্চিমে তার নামে গড়ে তোলা হয়েছে রুহুল আমিন নগর। একটু এগিয়ে গেলে দেখা যায় খালের উপর একটি সেতু হয়ে প্রশস্ত একটি সড়ক। সড়কে পথ ধরে এগিয়ে গেলে দেখা যায় এটি কোন জনপথ নয়, এটি একসময়ের ভূমিহীন রুহুল আমিনের বিলাসবহুল বাড়ীর প্রবেশ পথ। আর একটু এগিয়ে দেখা গেল, বাড়ীর দরজা থেকে পুরো উঠোন পাকা। উঠোনোর দুই পাশে ইটের তৈরী কয়েকটি বড় বড় বসার আসন। বাড়ীর বামে ইটের তৈরী বিল্ডিং এ থাকেন তিনি। ডানে রয়েছে পুকুরের আলিশান ঘাট। পূর্বদিকে দেখা গেল ফুলের নার্সারী। বাড়ীর চতুর্দিকে রয়েছে ৬টি হ্যালোজেন লাইট। বড় বড় দুটি সরকারি সোলার প্যানেল।

কথা হয়, বাড়ীর কেয়ারটেকার রাকিব হোসেনের সাথে। সে জানায়, ৬/৭ বছর যাবত এই বাড়ীতে আছে। তখন তার মালিক রুহুল আমিন পূর্বদিকের নার্সারীর জায়গায় একটি ছোট টিনের ঘরে থাকত। ২০১১ সালের দিকে সে এই ঘরটি তৈরী করে। তার সাথে কথা বলার সময় তার প্রথম স্ত্রী শিরীন আক্তার জানায়, ঘরটি ২০১১ সালে ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য হওয়ার পূর্বে ঋন নিয়ে তৈরী করেছে। পরে, ঋন পরিশোধ করা হয়েছে। সে আরো জানায়, তার স্বামী ৩ বছর আগে এক মক্কেল মামলা নিয়ে এলে স্বামীকে ডিভোর্স দিয়ে তাকে বিয়ে করে কিছুদিন জেলা শহরে বাসা ভাড়া নিয়ে থাকেন। এখন সাহেবের হাট বাজারের উত্তর পাশে শ্বশুর বাড়ীতে থাকে। তবে, তার নাম জানাতে পারেননি তিনি।

এলাকাবাসী তার ভয়ে মুখ খুলতে নারাজ। কিছুটা আশ্বস্থ করা হলে প্রতিবেশী সামছুন্নাহার ও শিল্পি জানান, রুহুল আমিন বাহিনীর ভয়ে তারা সবসময় ভীতসন্ত্রস্ত থাকে। রাতবিরাতে তারা ঘর থেকে বের হতে পারেন না। তারা আরো জানায়, ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে সদস্য নির্বাচিত না হওয়ায়, এলাকার শতশত নারী তাহজ্জতের নামাজ পড়ে শুকরিয়া আদায় করেন।

স্থানীয় বাসিন্দা সিদ্দিক মিয়া জানান, সরকারী জায়গার উপর তার নামে রয়েছে রুহুল আমিন নগর। সেখানে সে সরকারী জায়গা দখল করে তৈরী করেছে দোকান এবং দোকান বানিয়ে বিক্রি করে। রাস্তার উপর সবুজ বনায়নের বড় বড় গাছগুলো বিক্রি করে লক্ষ লক্ষ টাকা হাতিয়ে নেয়। রুহুল আমিন নগরের পশ্চিমে একরাম নগরে বিভিন্ন মৎস প্রকল্পে এবং রাস্তার পাশে খাস জমির দখল দিয়ে মোটা অংকের টাকা নেয়। আমিন উল্যা ভুলু, আবদুল হকের জমি দখল করে এ বছর একটি ব্রিকফিল্ড চালু করেছে। এছাড়াও তার নামে বেনামে ১০/১৫ একর জমি রয়েছে।

তিনি বলেন, এলাকার জায়গা-জমি কেনা-বেচা করতে হলে তার বাহিনীর সদস্য হাসান আলী রুলু, জসীম, সাহাবুদ্দিন, দুলাল, তাজল, জনু মাঝি, ফারুক মাঝি ও নূর মোহাম্মদ ক্রেতা ও বিক্রেতা উভয় পক্ষের কাছ থেকে চাঁদা আদায় করে। ভূমিহীনদের খাস জমি ক্রয়-বিক্রয় করতে হলে তাকে টাকা পয়সা দিতে হয়। তা না হলে কেনা-বেচা বন্ধ।

স্থানীয় বাসিন্দা শাহজাহান বলেন, মাদকেও রয়েছে তার একটি চক্র। স্বপন, সোহাগ এবং সোহেল তার ইয়াবা এবং গাঁজা বিক্রি করেন ও সরবরাহের দায়িত্বে রয়েছেন আবদুর রবের ছেলে হোসেন ড্রাইভার। প্রায় ১ বছর আগে চর জব্বর থানা পুলিশ হোসেন ড্রাইভারের ভাই আমিন ব্যাপারীকে ইয়াবা সহকারে গ্রেফতার করে আদালতে সোপর্দ করে। সে জামিনে রয়েছে। যার মামলা এখনো চলমান। এদের মাধ্যমে তিনি তার মাদক ব্যবসা করে লক্ষ লক্ষ টাকা আয় করেন।

স্থানীয় বাসিন্দা মোখলেছুর রহমান জানান, ২০০১ সলে জসীমের বাবা জয়নাল আবেদিন থেকে ৬৫ শতাংশ জমি ক্রয় করেন। ২০১৪ সালে তার জমির উপর জয়নালের ছেলে জসীমকে ঘর তৈরী করে দেয়। পরবর্তীতে ২০১৬ সালে সালিশের নামে ১৩৫০০০ (এক লক্ষ পঁয়ত্রিশ হাজার) টাকা জমা নিয়ে ঘর ভেঙ্গে দেয়। কিন্তু তাকে সে টাকা পরিশোধ করা হয়নি।

২০১৭ সালে একরাম নগর এলাকায় মো. কুট্টির গরু মো. জালাল বর্গা পালন করত। গরু চুরি করে মোমিন ও রাশেদ। কিন্তু গরু চুরি ধরা পড়ে। তখন রুহুল আমিন মোমিনকে মারধর করে। মোমিনের স্বীকারোক্তি দেয়, আরো ২/৩ টি জনের নাম বলে। পরে, পরে বিভিন্ন সময় চুরির মিথ্যা অপবাদ দিয়ে জহির, নূরনবী, মোমিন ও রাশেদ এর জায়গা-জমি এবং ঘরবাড়ী বিক্রি করে প্রায় ৪ লাখ টাকা আদায় করেন।

তিনি আরো জানান, বিদ্যুৎ সংযোগ দেয়ার নামে এলাকাবাসীর থেকে প্রায় ১০০০০০০ (দশ লক্ষ) টাকা আদায় করে কিন্তু সংযোগ এখনো পর্যন্ত পায়নি।

কামাল মাঝি জানান, তিনি মো. অলি থেকে জমি ক্রয় করেন। ওই জমি থেকে তাকে বেদখল করে ২০০০০০ (দুই লক্ষ) টাকা নিয়ে তার দখল বুঝিয়ে দেয়।

ভুলু নেতার জামাই জামাল জানান, প্রভাব দেখিয়ে তার শ্বশুরের জমির চাষাবাদ বন্ধ করে দিয়ে তার ভায়রা আবদুর রহমান, আজাদ এবং তার থেকে ৩০০০০০ (তিন লক্ষ) টাকা তারা স্থানীয় সমিতির বাজারে তার শ্বশুরের দোকান ভিটি থেকে ৩০০০০০(তিন লক্ষ) প্রদান করেন। কিন্তু এখনো সেই জমি কোন নিস্পত্তি করে নি এবং জমি চাষ বন্ধ করে রেখেছেন।

চর জব্বর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকতা মো. নিজাম উদ্দিন জানান, এ সমস্ত অভিযোগ আগে কখনো শুনেননি।

উল্লেখ্য, এই রুহুল আমিন নোয়াখালীর সুবর্ণচরে গত ৩০ ডিসেম্বর রাতে গণধর্ষনের ঘটনার মূল ইন্ধনদাতা।

Facebook Comments

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here