Home ইসলামিক সুদিরা কাফির, চিরজাহান্নামি

সুদিরা কাফির, চিরজাহান্নামি

121
SHARE

“যারা সুদ খায় তারা (কখনো মাথা উঁচু করে) দাঁড়াতে পারবে না, (দাঁড়ালেও) তাঁর দাঁড়ানো হবে সে ব্যক্তির মতো, যাকে শয়তান স্পর্শ করে (দুনিয়ার লোভ লালসায় মোহাচ্ছন্ন রেখে) পাগল করে দিয়েছে; এটা এজন্য যে, এরা বলে- ব্যবসা তো সুদের মতোই! অথচ আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল ও সুদকে হারাম করেছেন, অতএব যার নিকটে তার রবের পক্ষ হতে এ ব্যাপারে নির্দেশ পৌঁছেছে অতঃপর সে সুদের কারবার থেকে বিরত থেকেছে, সেক্ষেত্রে আগে যা হয়ে গেছে তা আল্লাহর নিকট সোপর্দ হয়ে গেছে, আর (এই নির্দেশের পরও) যারা এর পুনরাবৃত্তি করবে তারা জাহান্নামি; সেখানে তারা চিরকাল অবস্থান করবে।” (সূরা বাকারাঃ২৭৫)।

সুতরাং, আল্লাহ তায়ালার এই ঘোষণার পর আর এই বিষয়ে কোনো তর্কের সুযোগই থাকে না। সবচেয়ে বড় কথা হল- আল্লাহ তায়ালা যখন কোনো কিছুকে হারাম ঘোষণা করেন, তখন কোনো মু’মিন বান্দার এ বিষয়ে দ্বিমত পোষণ করার বিন্দুমাত্রও অবকাশ থাকে না।

হযরত যাবির (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রসূল (সাঃ) সুদ দাতা-গ্রহিতা-লেখক-সাক্ষীর প্রতি লা’নত করে বলেছেন, তারা (সুদের) গুনাহের ব্যাপারে সমান অপরাধী। (সূত্রঃ মুসলিম-২/২৭)।

শুধু তাই নয়, এই সুদ যে কতোটা মারাত্মক অপরাধ, তা পরের এই হাদিসটি থেকে জানা যায়- “হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রসূল (সাঃ) বলেছেন, সুদের মধ্যে সত্তর প্রকার গুনাহ বিদ্যমান; এর সবচেয়ে নিম্নস্তরের গুনাহটি হল- আপন মাতার সাথে যিনা-ব্যভিচার করা!” (ইবনে মাজাহ, পৃ-১৬৪)।

কিন্তু প্রশ্ন হলো- ইতোমধ্যে যারা সুদি কারবারে জড়িয়ে পড়েছে, ঋণগ্রহীতার কাছ থেকে সুদ বাবদ টাকা/সম্পদ পাওনা রয়েছে অথবা মূলধন এখনো উসুল হয়নি, তারা কী করবে? হ্যাঁ, তারা প্রথমেই আল্লাহর নিকট অনুতপ্ত হয়ে তওবা করবে।

এ বিষয়ে কুরাআনুল কারিমেই রয়েছে সুস্পষ্ট নির্দেশনা- “হে ঈমানদারগণ! আল্লাহকে ভয় করো, তোমরা যদি যথার্থই মুমিন হয়ে থাকো তবে অবশিষ্ট বকেয়া সুদ ছেড়ে দাও। আর যদি তা না করো, তাহলে জেনে রাখো- আল্লাহ ও তাঁর রসূলের পক্ষ থেকে (তোমাদের বিরুদ্ধে রয়েছে) যুদ্ধের ঘোষণা; তোমরা তওবা করলে মূলধন ফিরে পাবার অধিকারী হবে, তোমরা জুলুম করো না, তোমাদের ওপরও জুলুম করা হবে না।” (সূরা বাকারাঃ২৭৮-২৭৯)।

আমাদের দেশে বেশ কিছু আর্থিক প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যারা সুদের ব্যবসা করতে গিয়ে ঋণগ্রহীতার কাছ থেকে ঋণের টাকা আদায় করতে না পেরে থালা-বাটি পর্যন্ত দখল করে নিয়ে যায়; এমনকি ভিটে-মাটি থেকে পর্যন্ত উচ্ছেদ করে।

অথচ আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে সুদ গ্রহণ থেকে শুধু বিরত থাকতেই নয় বরং সেই ঋণগ্রহীতার প্রতি সহানুভূতি দেখানোর বিষয়ে বলছেন- “এবং সে (ঋণগ্রহীতা) অভাবগ্রস্ত হয়ে পড়লে স্বচ্ছলতা ফিরে আসা পর্যন্ত (তাকে) সুযোগ দাও, আর যদি (পাওনা মূল টাকা মাফ বা) সদকা করে দাও, তাহলে এটা তোমাদের জন্য বেশি ভালো হবে; যদি তোমরা জানতে!” (সূরা বাকারাঃ২৮০)।

সমস্যা হচ্ছে, আমাদের দেশে এমন বহু উন্নয়ন সংস্থা রয়েছে যাদের মাদার-প্রোগ্রামই হচ্ছে মাইক্রো-ক্রেডিট। তারা তো এই বিষয়ে কখনোই উদার নয় বরং অধিকাংশ ক্ষেত্রেই জালিম। এছাড়া এটা সংস্থার একটি নিয়মিত প্রোগ্রাম বিধায় অনেকেই এ চাকুরিতেই জীবনের পুরো সময়টা কাটিয়ে দেন। এটা আসলে তাদের অজ্ঞতা এবং দ্বীন সম্পর্কে উদাসীনতার জন্যই হয়েছে। আবার জেনে বুঝেও অনেকেই এটাই করে যাচ্ছে, যা সত্যিই মর্মান্তিক! সুতরাং, ব্যক্তি হোক বা এনজিও হোক, যারা জেনে বুঝে সুদের প্রোগ্রামের সাথে জড়িত, তারা চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত।

আবার কেউ কেউ ব্যবসা এবং সুদ উভয়কে এক বা অভিন্নও মনে করে থাকেন; এটা তাদের নিতান্ত অজ্ঞতা ও ভ্রান্তি। কেননা ব্যবসা ও সুদের মধ্যস্থিত পার্থক্যসমূহ দিবালোকের মতোই স্পষ্ট।

ব্যবসার মাধ্যমে যে অতিরিক্ত সম্পদ বা লভ্যাংশ অর্জিত হয়, তা হয় পণ্যের বিনিময়ে। আর সুদের মাধ্যমে কোনো পণ্য ছাড়াই অতিরিক্ত সম্পদ অর্জিত হয়। সোজা কথা হলো- টাকা হোক বা কোনো সম্পত্তি হোক, অর্থাৎ সমজাতীয় সম্পদ বিনিময়ের ক্ষেত্রে আদায়কৃত অতিরিক্ত অংশই সুদ।

অঞ্চলভেদে সুদের অবশ্য নানান ‘ডাকনাম’ রয়েছে। আমাদের অঞ্চলে সুদকে ‘জায়েজ’ করার জন্য ‘ঘর কট’ পদ্ধতি চালু রয়েছে, যেখানে আসলে মালিকানা বা ঘরের কোনো অস্তিত্বই নেই! এছাড়াও রয়েছে ‘জমি কট’, ফসলের জন্য ‘হাতাধানি’ প্রভৃতি নামে অভিনব সুদ গ্রহণ পদ্ধতি।

সারকথা এই- সুদকে যে নামেই ডাকা হোক না কেন, সুদের মাধ্যমে অর্জিত সম্পদ কোনোভাবেই হালাল হবে না। সুতরাং হারাম/অবৈধ উপায়ে সম্পদ অর্জনের মাধ্যমে গঠিত নাপাক শরীর নিয়ে ইবাদাত করলে সেটা আল্লাহর নিকট কোনভাবেই তা গ্রহণযোগ্য কিনা, এই প্রশ্ন থাকলো।

আমাদের দেশের এনজিওগুলোর অধিকাংশই সুদের দোষে দুষ্ট, যে কারণে প্রতিষ্ঠানগুলোকে অনেকেই ঘৃণার দৃষ্টিতে দেখে থাকেন। তবে দুঃখজনক হলেও এটা দিবাসত্য যে- আমাদের দেশের জিও (সরকারি) আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলিতে সুদভিত্তিক কার্যক্রম নিয়েই গঠিত ও পরিচালিত।

আবার এনজিও মানেই কিন্তু সুদের প্রোগ্রাম নয়। এমন কিছু বেসরকারি প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যারা সুদমুক্ত কার্যক্রম পরিচালনার জন্য চেষ্টা-সংগ্রাম করে যাচ্ছে। অর্থাৎ এনজিও বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠনেও সুদমুক্ত আয়ের ‘কিছুটা’ সুযোগ রয়েছে। তবে এই সুযোগটা একেবারেই সীমিত এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এটা মাদার প্রোগ্রামের অন্তর্ভুক্ত নয়, মেয়াদী প্রকল্প। আর প্রকল্পের চাকরি স্থায়ী নয় বলে বেশিরভাগ এমপ্লয়ি সুদের চাকরিকেই বেছে নিচ্ছেন।

অবশ্য যারা তাক্বওয়াশীল, (উপায়ান্তর না থাকায়) তারা এনজিওতে সুদমুক্ত প্রকল্পের চাকরি বেছে নিচ্ছেন। তবে হালাল আয়ের উপায় পাওয়া গেলে ‘সুদের সাথে ন্যূনতম সংশ্লিষ্টতা আছে’- এমন প্রতিষ্ঠান ত্যাগ করা উচিত।

আমাদের দেশের অর্থনীতি, ব্যবসা-বাণিজ্য বা লেন-দেন যে নীতির ভিত্তিতে গড়ে উঠেছে, তাতে সুদ নির্মূল করা কখনোই সম্ভব নয়। একটা প্রতিষ্ঠান থেকে তখনই সুদ বিদায় হবে, যখন সেই প্রতিষ্ঠানটির ব্যবসা ইসলামি অর্থনীতির ভিত্তিতে পরিচালিত হবে। একই কথা রাষ্ট্রের জন্যেও প্রযোজ্য।

কথা হচ্ছে, প্রাতিষ্ঠানিক/রাষ্ট্রীয়ভাবে সেই সুযোগ তৈরি না হওয়া পর্যন্ত কি তাহলে আমাদের জন্য সুদ বৈধ? এর উত্তর হচ্ছে- ‘না!’

তাহলে আমাদের করণীয় কী?

ব্যক্তি পর্যায়ে আমরা যা করতে পারি-
(১) ‘রিবা’ বা সুদকে হারাম বলে দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করা।
(২) নিজে সুদ গ্রহণ-প্রদান না করা এবং লেখক বা সাক্ষী না হওয়া।
(৩) সুদমুক্ত ‘শান্তির সমাজব্যবস্থা’ প্রতিষ্ঠিতকরণের জন্য চেষ্টা-প্রচেষ্টা করা।
(৪) ক্যারিয়ার হিসেবে কোনোভাবেই সুদের চাকরি গ্রহণ না করা।
(৫) সুদের চাকুরীতে নিয়োজিত থাকলে অতি দ্রুত তা ছেড়ে বিকল্প খুঁজে নেয়া।
(৬) বিকল্প থাকলে সুদি প্রতিষ্ঠানে (সুদমুক্ত প্রকল্পেও) চাকুরি না করা।

যদিও আমাদের জন্য সুদমুক্ত প্রতিষ্ঠানে কর্মসংস্থানের সুযোগ অত্যন্ত সীমিত এবং থাকলেও সেখানে আয়ের সুযোগ কম, তাই বলে কোনভাবেই সুদকে গ্রহণ করা বুদ্ধিমানের কাজ নয়। আর হারাম উপার্জনের মধ্যে তো বরকত ও স্বস্তি নেই, তার প্রমাণ আল্লাহ তায়ালার এই বাণী-
“আল্লাহ তায়ালা সুদ নিশ্চিহ্ন করেন, আর দান-সদকাকে তিনি (উত্তোরোত্তর) বৃদ্ধি করেন; আল্লাহ তায়ালা অকৃতজ্ঞ আর পাপিষ্ঠকে ভালোবাসেন না।” (সূরা বাকারাঃ২৭৬)।

তবুও যারা সুদ থেকে মুক্ত থাকবে না তাদের প্রসঙ্গে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতায়ালার চূড়ান্ত ঘোষণা হল এই-
“সুস্পষ্টভাবে নিষেধ করার পরও তারা সুদ গ্রহণ এবং অন্যায়ভাবে মানুষের মাল-সম্পদ গ্রাস করে; তাদের মধ্যকার (এই ধরণের) কাফিরদের জন্য কঠিন আযাব প্রস্তুত করে রেখেছি। (সুরা নিসাঃ১৬১)।”

লেখক-  এটিএম গোলাম ছারওয়ার হিরো, প্রভাষক, সোনাপুর ডিগ্রী কলেজ, নোয়াখালী।

Facebook Comments

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here