Home মুক্ত মতামত সফল পিতা মাতা হতে হলে আমাদের করণীয়

সফল পিতা মাতা হতে হলে আমাদের করণীয়

325

ফেরদৌস আলমঃ আমাদের গ্রামে এক চাচার নাম এরশাদ। আমি তখন ছোট ছিলাম। বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি ছিলেন জেনারেল হুসাইন মোহাম্মদ এরশাদ। গ্রামের লোকজন ওই চাচার সাথে মজা করে বলতেন বাংলাদেশের সরকার। নামের সাথে নামের মিল থাকলে যেমনি ভাবে সরকার হওয়া যায় না ঠিক তেমনি ভাবে ছেলে মেয়ের জন্ম দিলেই পিতা মাতা হওয়া যায় না। কারণ নামের পাশে কাজের একটা সম্পর্ক থাকে। পিতা মাতার প্রতি সন্তানের যেমন দায়িত্ব আছে তেমনিভাবে সন্তানের প্রতিও পিতা মাতার অনেক দায়িত্ব আছে। সন্তান জন্ম দেওয়া এবং লালন পালন করার মাধ্যমে পিতা মাতা শব্দের প্রতি সঠিক বিচার সীমাবদ্ধ নয়। সন্তান জন্মের পর থেকে সে যতদিন বেঁচে থাকবে ততদিন পর্যন্ত বাবা মাকে অবশ্যই কিছু না কিছু দায়িত্ব পালন করতে হবে। দায়িত্বটা সময় এবং প্রয়োজন অনুযায়ী পালন করতে হবে। তাহলে আপনি সার্থক পিতা মাতা হতে পারবেন। মনে রাখবেন আপনার এই দায়িত্ববোধ আপনার সন্তানকে দায়িত্ববান করে তুলবে। সন্তানকে ভালোভাবে গড়ে তোলার জন্য পরিবারই হচ্ছে সর্বশ্রেষ্ঠ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। কারণ বেশিরভাগ সময় তারা পরিবারের সাথে থাকেন। একটি শিশু খুব ভালোভাবে বাবা-মাকে প্রত্যক্ষ করেন। তাই বাবা-মায়ের আচরণগত দিক,উঠাবসা এবং চলাফেরার গতিবিধি অবশ্যই একটি নিয়মের ভিতরে হতে হবে। নিজেদের ভিতরে শৃঙ্খলা না থাকলে অবশ্যই বাচ্চাদের ভিতর সেটা আসবে না। বাবা মাকে লালন পালনের পাশাপাশি আরো অনেক কিছু শিশু সন্তানকে শিখাতে হবে যেমন-কার সাথে কেমন ব্যবহার, ঘরে বাইরে কিভাবে চলতে হয়, কখন সে পড়বে, কখন সে প্রার্থনা করবে, খেলার সময়, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের প্রতি তার আচরণ কেমন হবে, সমাজের এবং রাষ্ট্রের প্রতি প্রতি তার দায়িত্ববোধ ইত্যাদি। আপনার সন্তান যখন বয়ঃসন্ধিকালে পা দিবে তখন অবশ্যই আপনাকে বিশেষ সর্তকতা অবলম্বন করতে হবে। যদি আপনি এই সময়টাতে সন্তানের প্রতি উদাসীনতা ও বেশি দয়া দেখান তাহলে কিন্তু আপনি তাদের সার্থক বাবা মা হতে পারবেন না। একটি সময় আসবে যখন তারা বুঝতে পারবে আপনি তাদের প্রতি ভালোভাবে দায়িত্ব পালন করেননি তখন কিন্তু তারাও আপনাদের পাশে থাকবে না আর এটাই বাস্তব। এই সময়টাতে আপনার সন্তানের চলাফেরা পর্যবেক্ষণ করুন, তারা কাদের সাথে মিশে, কখন কোথায় যায়, তাদের ভিতর কোন কিছুর অভাব বোধ আছে কিনা, তারা কোন নেশা জাতীয় জিনিসের প্রতি আসক্ত কিনা, আপনার কাছে তারা কোন কিছু গোপন করে কিনা ইত্যাদি। আপনি যদি বুঝতে পারেন কোথাও একটা সমস্যা আছে তাহলে আপনাকে অবশ্যই কৌশলে এগিয়ে যেতে হবে। সময় বুঝে সন্তানকে শাসন করতে হবে। তাদের সাথে আপনাকে বেশি বেশি সময় দিতে হবে এবং তাদেরকে ভালো-মন্দ বাস্তবতা বুঝিয়ে দিতে হবে। আপনি যদি মনে করেন আপনি তা পারছেন না তাহলে আপনার সন্তান পরিবারের যে সদস্যের সাথে অথবা শিক্ষক অথবা আত্মীয় স্বজনের যার সাথে বেশি ভালো সম্পর্ক তাকে দিয়ে বোঝানোর চেষ্টা করেন। যেকোনো সমস্যা প্রাথমিক অবস্থায় ভালোভাবে সমাধানের চেষ্টা করুন। একটি উদাহরণ দেই-আমি তখন ঢাকা সরকারি বিজ্ঞান কলেজে ছাত্র। ছোটবেলা থেকেই খেলাধুলার প্রতি প্রবল আসক্তি ছিল। দাবা খেলায় যথেষ্ট ভালো ছিলাম। বন্ধুর বাসা আমার বাসা থেকে অল্প দূরে। একবার ছুটির দিনে বন্ধুর বাসায় তার সাথে দাবা খেলা চলছিল। খেলা টা বেশ জমে উঠল সন্ধ্যা হয়ে রাত ঘনিয়ে আসে।রাত ১১ টা, ঢাকার গেন্ডারিয়ার বাসার সামনে আসতেই আমার দৃষ্টি যখন আমার পরিবারের সদস্যদের দিকে পড়ল তখন আমার প্রাণ পাখি যায় যায় অবস্থা। বড় দুই ভাই বাসার বাইরে হেলান দিয়ে বসে আছে, বোনটি জানালা দিয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে। দরজার কাছে যেতে ভেতর থেকে বাবার কন্ঠ শুনতে পেলাম। বাবা মাকে বললো, তোমার ছেলে একটি সত্বে বাসায় প্রবেশ করতে পারবে যদি সে আর কোনদিন সন্ধ্যার পরে বাইরে অবস্থান না করে। আম্মার মুখ থেকে কথা বের হওয়ার আগেই বলে ফেললাম আর কোন দিন সন্ধ্যার পরে বিনা অনুমতিতে বের হবো না। পরিবারের সবাই আমার কথা শুনে হেসে ফেলল। সবাই আমাকে অনেক জ্ঞান দিলেন। সেদিন থেকে এখন পর্যন্ত সন্ধ্যার পরে যখন বাবা মায়ের সাথে থাকি অনুমতি ছাড়া বাইরে যাই না। আলহামদুলিল্লাহ, নামাজের ব্যাপারে আমার বাবা-মা সেই ছোটবেলা থেকেই ভেরি সিরিয়াস। বাবা আযানের সময় আর মা ফযর আযানের আগে উঠে যেতেন। বাবা নিশ্চিত করতেন আমরা মসজিদে যাচ্ছি কিনা। একদিন বড়ভাই উঠতেএকটু দেরি করেছেন। বাবার বজ্রপাতের মত আওয়াজ আজো মনে পড়ে।আজো বাড়িতে গেলে প্রতি ওয়াক্ত সালাতের সময় নিশ্চিত করেন। বাবা বলেন আগে ধর্ম তারপর কর্ম। সন্তানেরা বড় হয়ে গেলে সময়ভেদে বাবা মা থেকে হয়তো দুরে থাকতে হয় কিন্তু দীর্ঘ সময় বাবা মায়ের সাথে থাকার কারণে যে ভালো অভ্যাসগুলো গড়ে ওঠে তা তাকে দুরে চলতে সাহায্য করে। ছেলে মেয়েদের শরীর চর্চা বা ব্যায়াম করতে উৎসাহিত করা দরকার। তাদেরকে নিয়ে মাঝে মাঝে কোথাও ঘুরতে বের হন। এটা তাদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশে সহায়তা করবে। ভালো কাজে তাদের উৎসাহ প্রদান করেন এবং খারাপ কাজের ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে বিস্তারিত বলুন। মানবতা ও মানব জীবনের মূল্যবোধ সম্পর্কে জানতে দিন। মাঝে মাঝে ছেলে মেয়েদের সাথে ধর্মীয় আলোচনায় অংশ নেন। বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া মোবাইল ফোন ব্যবহারে সতর্ক হোন। ছোটবেলা থেকেই তাদেরকে কাজ ও পরিশ্রম করতে শেখান। আপনার সন্তানকে মানুষকে ভালবাসতে শেখান। কথা ও কাজের মাধ্যমে তাদের প্রতি দয়া ও ভালোবাসা দেখান। বড় হলে তাদের প্রতি নরম সুরে কথা বলেন। ছাত্রজীবনে সন্তানরা যাতে বেশি বন্ধুদের সাথে অতিরিক্ত সময় ব্যয় না করে সেদিকে ও আমাদেরকে খেয়াল রাখতে হবে। কারণ অতিরিক্ত বন্ধু আপনার সন্তানের শিক্ষা জীবনকে ক্ষতিগ্রস্থ করে দিতে পারে। অবশেষে, পিতা মাতারা যদি তাদের সন্তানকে মানুষ করতে ও প্রকৃত শিক্ষায় শিক্ষিত করতে সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারেন তাহলে ইনশাআল্লাহ আপনাদের সন্তানেরা আপনাদের প্রতি সর্বোচ্চ দায়িত্ব পালন করবেন। আর তাদের মাঝেই আপনাদের মত দায়িত্ববান পিতা মাতার জন্ম হবে এবং মহান রাব্বুল আলামিনের কাছ থেকে সৃষ্টির সেরা জীব এর পুরস্কার পেয়ে যাবেন। একদিন আপনি হয়তো থাকবেন না কিন্তু আপনার বংশধরদেরকে দেখে নিশ্চয়ই মানুষ আপনাকে অনুভব করবে। এভাবেই আপনি বেঁচে থাকবেন পৃথিবী ধ্বংসের আগ পর্যন্ত। আসুন আমরা সবাই মিলে একটি সুন্দর পরিবার গড়ে তুলি। আমিন।

লেখক ও গবেষক-
শিক্ষক (ইংরেজি মাধ্যম)
মাইলস্টোন স্কুল এন্ড কলেজ, গাজীপুর, ঢাকা।

Facebook Comments