মৃত্যুর পর সওয়াব পাওয়া আমল সমূহ

এমন কিছু আমল রয়েছে যা নিয়ত সঠিক-শুদ্ধ ভাবে পালন করলে মৃত্যুর পরও সাওয়াব পাওয়া যায়। হাদিস অনুযায়ী আমল গুলোর সংক্ষিপ্ত একটি তালিকা দেওয়া হলো।
রাসুল (সা.) বলেন, ‘মানুষ মৃত্যুবরণ করার পর কবরে ৭টি আমলের সাওয়াব অব্যাহত থাকে : ১. যে ইলম শিক্ষা দিল, ২. যে পানি প্রবাহিত করল, ৩. কুপ খনন করল, ৪. খেজুর গাছ লাগালো (গাছ রোপন), ৫. মাসজিদ তৈরি করল, ৬. কারো দায়িত্বে কিতাব দিয়ে গেল ও ৭. এমন নেক সন্তান রেখে গেল- যে তার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করবে।’
ইলম শিক্ষা দেয়া : রাসুল (সা.) বলেন, ‘যে মানুষকে ইলম শিক্ষা দিলো, এ ইলম অনুযায়ী আমলকারীর সমপরিমাণ সওয়াব তার আমলনামায়ও যুক্ত হতে থাকবে। অথচ তাদের কারো সওয়াবে কোনো কমতি হবে না।(ইবনু মাজাহ, হাদিস নং : ২৪০)
মাসজিদ তৈরি করা : মসজিদ তৈরি করলে তাতে নামাজ আদায়ের পাশাপাশি কুরআন শিক্ষা কার্যক্রম ও দ্বীনি বিষয়ক শিক্ষাদান সহ বিভিন্ন কল্যাণমূলক কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়ে থাকে। রাসুল (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহর জন্য মাসজিদ তৈরি করল, আল্লাহ তার জন্য জান্নাতে ঘর তৈরি করবেন।’(মুসলিম, হাদিস নং : ১২১৮)
সৎ সন্তান রেখে যাওয়া : রাসুল (সা.) বলেন, ‘মানুষ মৃত্যুবরণ করার পর ৪টি আমলের সাওয়াব অব্যাহত থাকে :
* যে ব্যক্তি এমন সাদাকাহ করলো, যা প্রবাহমান থাকে, তার সাওয়াব, *যে ব্যাক্তি ইসলামী রাষ্ট্রের সীমান্ত পাহারা দিল তার সাওয়াব,
*যে ভাল একটি ভালো কাজ চালু করলো এবং অন্যরা তাকে অনুসরণ করল, তার সাওয়াব, *এমন নেক সন্তান রেখে যাওয়া- যে তার জন্য দোয়া করে।’ (মুসনাদ আহমাদ, হাদিস নং : ২২২৪৭)

কুরআন বিতরণ করা : কোনো ব্যক্তি যদি মসজিদ, মাদরাসা বা অন্য কোন প্রতিষ্ঠান অথবা যে কাউকে পবিত্র কোরআন বিতরণ করেন, তাহলে সেগুলোর সাওয়াবের অংশও সে পাবে।
(মুসনাদুল বাজ্জার :৭২৮৯)

গাছ রোপন করা :  হাদিসে আছে, ‘কোন মুসলিম যদি কোন বৃক্ষরোপন করে, আর তা থেকে কোন ফল কোন ব্যক্তি খায়, কোন ব্যাক্তি যদি চুরি করে খায়, কোন পাখিও যদি খায় তাও তার জন্য সদাকাহ। এমনকি যদি কোন ব্যাক্তি সেই গাছ কেটে ফেলে দেয় তাও তার জন্য সাদকাহ।’( মুসলিম, হাদিস নং : ৪০৫০)
সীমান্ত রক্ষা করা : রাসুল (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি ইসলামী রাষ্ট্রের সীমান্ত পাহারা অবস্থায় মারা যায়, তাহলে যে পাহারার কাজ সে করে যাচ্ছিল সে ব্যক্তি মৃত্যুর পরও সেই কাজের জন্য সওয়াব চলমান থাকবে, এমনকি তার রিজিকও জারি থাকবে, কবরের পরীক্ষা থেকে সে নিরাপদ থাকবে এবং আল্লাহ তাআলা কেয়ামতে তাকে ভয় থেকে মুক্ত অবস্থায় ওঠাবেন।’(ইবনু মাজাহ, হাদিস নং : ২২৩৪)
অন্য হাদিসে রাসুল (সা.) বলেন, ‘মৃত্যুর পর প্রত্যেক মৃতের কর্মের ধারা শেষ করে দেয়া হয়। তবে যে ব্যক্তি আল্লাহর জন্য ইসলামী রাষ্ট্রের সীমান্ত পাহারা দেয় তার আমল কিয়ামত পর্যন্ত বাড়তে থাকবে এবং কবরের ফিতনা থেকেও সে নিরাপদ থাকবে।’(ইবনু হিব্বান, হাদিস নং : ৪৬২৪)

অভাবগ্রস্থদের ঘর-বাড়ি তৈরি করে দেওয়া
রাসুল (সা.) বলেন, ‘মুমিন মৃত্যুবরণ করার পর তার সাথে যে আমলের সাওয়াব সম্পৃক্ত থাকবে, তা হলো ইলম শিক্ষা দেয়া ও কিতাব রচনা করা, নেক সন্তান রেখে যাওয়া, মসজিদ তৈরি করা, অভাবগ্রস্থদের জন্য ঘর তৈরি করে দেয়া, পানি প্রবাহিত হওয়ার ব্যবস্থা করা এবং তার সম্পদ থেকে সাদাকাহ করা।(ইবনু খুযাইমাহ : ২৪৯)

খাওয়ার পানির ব্যবস্থা করা
হাদিসে রাসুল (সা.) বলেন, এক লোক রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিল, তার খুব পানির পিপাসা পেল, পথে সে একটি কূপ দেখলো এবং সে কুপ থেকে পানি পান করল। অতঃপর দেখতে পেল একটি কুকুর পানির পিপাসায় ময়লা খাচ্ছে, তখন সে কূপ থেকে পানি নিয়ে মোজায়পানি ভরে কুকুরকে পান করাল এবং আল্লাহতায়ালার শুকরিয়া আদায় করল। এজন্য আল্লাহ তাআলা তাকে মাফ করে দিলেন। সাহাবায়ে কিরাম জিজ্ঞাসা করলেন, হে আল্লাহর রাসুল! একটি প্রাণীকে পানি পান করালেও সাওয়াব আছে? রাসুল (সা.) বললেন, প্রত্যেক সজীব অন্তরকে পানি পান করানোর জন্য সাওয়াব রয়েছে।’(বুখারি, হাদিস নং : ৬০০৯)

প্রবাহিত পানির ব্যবস্থা করা
রাসুল (সা.) বলেন, ‘যে পানির ঝর্ণা তৈরী করল, তার জন্য জান্নাত রয়েছে।’(বুখারি, হাদিস নং : ২৭৭৮)

সদকায়ে জারিয়া
‘সদকা’ শব্দের অর্থ দান করা। আর ‘জারিয়া’ অর্থ অব্যাহত। আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টি অর্জনের লক্ষে শরিয়তসম্মত এমন কল্যাণকর কাজে দান করা। যেমন- মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করা, এতিমখানা প্রতিষ্ঠা করা, হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করা, পাঠাগারের ব্যবস্থা করা, রাস্তাঘাট নির্মাণ করা ইত্যাদি। রাসুল (সা.) বলেন, ‘মানুষ মৃত্যুবরণ করলে তার যাবতীয় আমল বন্ধ হয়ে যায়। তবে ৩টি আমল বন্ধ হয় না,
০১. সদকায়ে জারিয়া, ০২. এমন ইলম-যার দ্বারা উপকৃত হওয়া যায়, ০৩. এমন নেক সন্তান, যে তার জন্য দোয়া করে।(মুসলিম, হাদিস নং : ৪৩১০)

আল্লাহর দিকে দাওয়াত দেয়া
পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘ঐ ব্যক্তির চাইতে উত্তম কথা আর কার হতে পারে যে আল্লাহর দিকে ডাকলো, নেক আমল করলো এবং ঘোষণা করলো আমি একজন মুসলমান ‘ (সুরা হামিম সিজদাহ, আয়াত : ৩৩)
রাসুল (সা.) তার সাহাবাদের বলেন, ‘মানুষকে হিদায়াতের দিকে আহ্বান করবে, এ কাজ সম্পাদনকারীর অনুরূপ সাওয়াব তার আমলনামায় যুক্ত হতে থাকবে। অথচ তাদের সাওয়াব থেকে কোন কমতি হবে না।’(মুসলিম, হাদিস নং : ৬৯৮০)

বইপত্র/কিতাব রচনা করা
এমন বইপত্র কিংবা কিতাব রচনা করা, যার মাধ্যমে মানুষের কল্যাণ ও উপকার হয়। মানুষ সঠিক পথের দিশা পায়। হাদিসে এসেছে, ভাল কাজের পথপ্রদর্শনকারী এ কাজ সম্পাদনকারীর অনুরূপ সাওয়াব পাবে।’(তিরমিজি, হাদিস নং : ২৬৭০)
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবসময় উত্তম আলম ও মানবতার জন্যে কাজ করার তাওফিক দান করুন এবং আমাদের আমলগুলো কবুল করে নিন।আল্লাহ তাআলা মুসলিম উম্মাহকে মৃত্যুকালীন সময়ের কষ্ট থেকে হেফাজত করুন। পরকালের নাজাত দান করুন। আমিন।

Facebook Comments
We will be happy to hear your thoughts

Leave a reply

error: Content is protected !!
subarnabarta
%d bloggers like this: