Home ইসলামিক মাহে রমাদ্বান : অর্জনীয়-বর্জনীয়

মাহে রমাদ্বান : অর্জনীয়-বর্জনীয়

77
SHARE

আজ থেকে শুরু হলো সিয়াম সাধনার মাস- মাহে রমাদ্বান। এই মাসকে ঘিরে মুসলিম উম্মাহর মাঝে উৎসাহ উদ্দীপনার শেষ নেই। মুসল্লিতে মসজিদসমূহ কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে গেছে- এটা বেশ আশার কথা।

মাহে রমাদ্বান। অত্যন্ত বরকতময় একটি মাস। বান্দাহর জন্য রহমাতের মাস। মাগফিরাহ, জাহান্নাম থেকে মুক্তির মাস। এটি হচ্ছে সেই মাস, যে মাসে জান্নাতের দ্বারসমূহ উন্মুক্ত হয়ে যায়; রুদ্ধ করে দেয়া হয় জাহান্নামের দুয়ার! খুলে দেয়া হয় আকাশের ফটকসমূহ; অজস্র ধারায় বর্ষিত হতে থাকে রহমাহ-বারাকাহ! আর শাইত্বানকে অ্যারেস্ট করা হয়; একমাস সে থাকে আল্লাহর বিশেষ কারাগারে!

তাক্বওয়া অর্জনের এই মাসে আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে মগ্ন থাকবে মুসলিমগণ। কিন্তু আফসোসের বিষয়- এই ইবাদাতকে ঘিরেও আমাদের দেশে প্রচলিত রয়েছে নানান বিদআহ। আমরা এমন সব কর্মকান্ডে নিয়োজিত থাকি, যার সাথে ইসলামের ন্যূনতম সম্পর্ক খুঁজে পাওয়া যায় না। তাহলে প্রশ্ন থাকছে- বাংলাদেশের জন্য রমাদ্বান কী আলাদা নাজিল হয়েছে?!

ইবাদাতের নামে আমরা আসলে কী করছি? আমলের নামে আমাদের দেশে এমন কিছু বিষয় প্রচলিত আছে, যার উৎস সম্পর্কে কোনো ধারণা পাওয়া যায় না। যারা এসব আমল করে আসছেন, তাদের মনে এই প্রশ্নটা কি কখনোই জাগে না- আল্লাহর রসূল(সাঃ) যে ইসলাম আমাদের জন্য রেখে গেছেন, আমরা কি সেই ইসলাম পালন করছি?

রমাদ্বানেও ইবাদাতের নামে আমরা যা করছি, তার অনেকক্ষেত্রেই বিদআহ’র সংশ্লিষ্টতা প্রমাণিত। যেমন: সাহরির সময়ঃ “নাওআইতু আন আছুম্মা…” বলে নিয়্যত করা। ইফতারের সময়ঃ বানানো কিছু দোয়াকে নিয়মিত আমল হিসেবে গ্রহণ করা। তারাবীর সময়ঃ প্রতি চার রাকআত শেষে ‘বিশেষ দোয়া’ পাঠ, ইত্যাদি। এইসব ‘বিশেষ আমল’ আমরা কোথা থেকে পেয়েছি? এই ধরনের কোনো দোয়া কি রসুল(সাঃ) থেকে প্রমাণিত?

রমাদ্বানে সাহরি বা ইফতারির জন্য বিশেষ উচ্চারণযোগ্য কোনো ‘নিয়্যত’ নির্দিষ্ট নেই। সিয়ামের জন্য নিয়্যত করতেই হবে, কেননা কোনো আমলই নিয়্যত ব্যতিরেকে কবুল হয় না। মনের সংকল্প বা দৃঢ় সিদ্ধান্ত গ্রহণই নিয়্যত। সুতরাং সাহরির পর মুখে কোনো ‘নিয়্যত’ উচ্চারণের সুযোগ নেই। ‘নাওয়াইতু’ বলে যে কথাগুলি দ্বারা নিয়্যত করা হয়, এটা বিদআহ বলে অবশ্যই পরিত্যাজ্য।

ইফতারের সময়টা দোয়া কবুলের বিশেষ সময়। এজন্য নির্দিষ্ট কোনো দোয়া নেই; যে কোন নেক দোয়া নিজের ভাষায় করা যায়। তবে ক্বুরআন-সুন্নাহ মোতাবেক যে দোয়াগুলি অনুমোদিত, জানা থাকলে সেগুলি করা উচিত। হাদীসে উল্লেখিত এরকম একটি দোয়া-
اللهم إني أسألك برحمتك التي وسعت كل شيء أن تغفرلي
“আল্লাহুম্মা ইন্নী আসআলুকা বিরহমাতিকাল্লাতি ওয়াসিয়া’ত কুল্লা শাইয়্যিন আন তাগফিরালি।”
-ইবনে মাযাহ:১/৫৫৭।
অর্থঃ “হে আল্লাহ! আপনার যে রহমাহ সকল কিছু বেষ্টন করে রয়েছে, তার দ্বারা প্রার্থনা জানাই- আপনি আমাকে মাফ করে দিন।”

দুই.
মুসলিম উম্মাহর জন্য পূর্বেও সাওম ফরদ্ব ছিল। উম্মাতি মুহাম্মাদ(সাঃ) এর জন্যেও সিয়াম পালন আবশ্যিক। অত্যন্ত কঠিন এক ইবাদাহ। এর পুরষ্কারও অত্যন্ত দামী। ইফতারের আনন্দ, হাশরদিবসে আরশের নিচে আল্লাহর মেহমানদারি, জান্নাতে ‘রাইয়্যান’ গেইটে বিশেষ অভ্যর্থনা- এরকম অসংখ্য পুরষ্কার রয়েছে সায়িমদের জন্যে। সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি হচ্ছে- মহামনিব রব্বুল আলামীন, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতাআ’লার সরাসরি সাক্ষাৎ লাভ। আল্লাহ আকবার!

এই পরম আকাঙ্খিত পুরষ্কারের জন্য মনোনীত হওয়াটাও চাট্টিখানি ব্যাপার নয়। পুরষ্কার যেমন বড়, ইবাদাতও তেমনি কঠিন। সুতরাং অত্যন্ত সতর্কতার সাথে এই নেয়ামত অর্জন করতে হবে। আর সে কারণেই ইবাদাতকে হতে হবে যাবতীয় শির্ক-বিদআতমুক্ত।

সাওম পালন মানে কেবল উপবাস এবং কামপ্রবৃত্তি দমনের নাম নয়। এই দুটো কাজ সাওমের ফাউন্ডেশন মাত্র; উদ্দেশ্য অর্জনের জন্য আরো অনেক কিছুই কর্তব্য ও বর্জনীয়। তা না হলে সাওম পালন হবে (হয়তো), কিন্তু তা কোনোই কাজে আসবে না- এটা কুরআন-সুন্নাহ দ্বারা প্রমাণিত। সুতরাং প্রথমেই জানা দরকার, কী কী বিষয় বর্জনীয়।

⏩ঈমান গ্রহণের পর আল্লাহ তায়ালা মুসলিমদের জন্য যে সকল বিষয় নিষেধ করেছেন, সবই বর্জনীয়। গুণাহে কবিরাহ; যে কাজগুলি করলে কুফরি হয়ে যায়, তা থেকে সবসময়ই বিরত থাকা অপরিহার্য। বিশেষত: শির্ক-বিদআহ থেকে বেঁচে থাকতে হবে।

⏩গীবত বা পরনিন্দা, চোগলখোরি থেকে বিশেষভাবে নিবৃত্ত থাকতে হবে। (প্রয়োজনে স্থান ত্যাগ করতে হবে)।

⏩মিথ্যা, প্রতারণা, সুদ-ঘুষ, রেহম-এর সম্পর্ক বিনষ্ট, কারো স্বার্থ নষ্ট, যিনা-ব্যভিচার, পর্দা বিনষ্ট করা, অশ্লীলতা বা গান-বাদ্যের সাথে সংশ্লিষ্টতা ইত্যাদি যাবতীয় হারাম আমল চিরদিনের মতো ত্যাগ করতে হবে।

⏩ক্ষুধার্ত মানুষ অকারণেই রেগে যায়, এই বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে। কটুকথা বা অশ্লীল বাক্য থেকে বিরত থাকতে হবে। মুসলিম উম্মাহর মধ্যে সম্প্রতি রক্ষা করা ফরদ্ব; কলহ-বিবাদকে আল্লাহ তায়ালা হত্যার চাইতেও মারাত্মক গুণাহের কাজ বলে সতর্ক করে দিয়েছেন।

⏩বর্তমান যুগ ফিতনার যুগ। আর তরুণ-যুবা থেকে শুরু করে প্রৌঢ়, এমনকি বৃদ্ধদের ঈমান-আমল বিনষ্ট হওয়ার জন্য মোবাইল/ইন্টারনেট প্রযুক্তিই যথেষ্ট। বিনোদন বা সময় কাটানোর উদ্দেশ্যে নেট/ফেসবুক ব্যবহার করা যাবে না।

⏩এককথায় আল্লাহ তায়ালা নিষিদ্ধ করেছেন এমন সকল মন্দ কাজ পরিপূর্ণভাবে বর্জন করতে না পারলে সাওম থেকে কোনো উপকার আশা করা বোকামি।

তিন.
“রমাদ্বান হল সেই মাস, যাতে নাযিল করা হয়েছে কোরআন, যা মানুষের জন্য হেদায়েত এবং সত্যপথ যাত্রীদের জন্য সুষ্পষ্ট পথ নির্দেশ আর ন্যায় ও অন্যায়ের মাঝে পার্থক্য বিধানকারী।…” -সূরা বাক্বারাহ:১৮৫
রমাদ্বানে করণীয় কী?

⏩ঈমান গ্রহণের পর যে কাজটি সর্বপ্রথম ফারদ্ব করা হয়েছে, তা হচ্ছে সালাত। সহীহ হাদীসে সালাতকে বান্দাহ ও কুফরের পার্থক্যকারী হিসেবে আখ্যা দেয়া হয়েছে; সালাত ত্যাগকারী কাফির! সুতরাং সালাত আদায় না করে কেবল সাওম পালনে কী লাভ হবে, তা সহজেই অনুমেয়। সুতরাং ফারদ্ব সালাত কোনো অবস্থাতেই হেলা করে ছাড়া যাবে না।
⏩রমাদ্বানে ঈমানের সাথে সাওয়াবের আশায় (তারাওয়ীহ) সালাত আদায়কারীর অতীতের সমস্ত পাপ ক্ষমা করে দেয়া হয়। (সূত্র: বুখারি:১৮৬৮)। সুতরাং এই মাসে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যে তারাওয়ীহ যথাযথভাবে আদায় করা জরুরী। পাশাপাশি অন্যান্য নফল/তাহাজ্জুদ ইত্যাদি সালাত আদায় করা উচিত।
⏩সালাত-সাওমের পাশাপাশি এই মাসে দান-সাদাকাহকে বিশেষভাবে উৎসাহিত করা হয়েছে।
⏩আত্মীয়, প্রতিবেশী, ইয়াতিম-মিসকিন সর্বোপরি দরিদ্রদের প্রতি উদার হওয়ার মাস এই রমাদ্বান। ইফতারিতে কাউকে শামিল করে নেয়া বা কাউকে খাদ্য সামগ্রী পৌঁছে দেয়া- অশেষ সাওয়াবের কাজ।
⏩যথাসম্ভব নেক কাজে বেশি বেশি অংশগ্রহনের চেষ্টা করতে হবে।

চার.
ইবাদাতের নামে বিদআতকেই আঁকড়ে ধরে আছেন, তাদের উদ্দেশ্যে রসূল(সাঃ)-এর কয়েকটি বার্তা-

👉“যে ব্যক্তি এমন কোনো আমল করলো, যা করার জন্য আমাদের থেকে বলা হয়নি, তা গ্রহণযোগ্য নয়।” (মুসলিমঃ৪৪৯৩)।

👉“(বিদআতিদের ওপর) আল্লাহ তায়ালার, সমস্ত মালাইকা ও সকল মানুষের লা’নত। কিয়ামতের দিন তার কোন ফরজ-নফল ইবাদত কিছুই কবুল করা হবে না।” (মুসলিমঃ৩৩৩০)

👉“…(আমল-ইবাদতের মধ্যে) প্রত্যেক নতুন সৃষ্টিই বিদআত। প্রত্যেক বিদআত হলো গোমরাহি (পথভ্রষ্টতা), আর প্রত্যেক গোমরাহি-ই জাহান্নামি।” (সুনানু নাসায়ীঃ১৫৭৮)।

আল্লাহ আমাদেরকে সঠিক বুঝ দান করুন এবং সব ধরণের বিদআহ ও ফিতনাহ থেকে হেফাযত করুন, আমিন।

লেখক- এটিএম গোলাম ছারওয়ার হিরো, প্রভাষক, সোনাপুর ডিগ্রী কলেজ, নোয়াখালী।

Facebook Comments

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here