Home ইসলামিক তারাওয়ীহ : ৮/২০ বিতর্কের সমাধান!

তারাওয়ীহ : ৮/২০ বিতর্কের সমাধান!

248
SHARE

সাম্প্রতিক সময়ে সালাতুত তারাওয়ীহ’র রাকা’ত সংখ্যা নিয়ে ফিতনা চূড়ান্তরূপ ধারণ করেছে। ৮/২০ রাকা’ত প্রশ্নে তুমুল তর্ক-বিতর্ক, হাতাহাতি, মারামারি, এমনকি মসজিদ থেকে বের করে দেয়ার মতো জঘন্যতম ঘটনা পর্যন্ত ঘটে চলছে! এই বিষয়ে বিতর্কের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি এবং ফিতনার অবসান হওয়া মুসলিম উম্মাহর জন্য ভীষণ জরুরি।

আসুন, সাওয়াল-জওয়াবের মাধ্যমে আমরা এর একটা সমাধান খুঁজে নেয়ার চেষ্টা করি।

প্রশ্ন : তারাওয়ীহ ৮/২০রাকা’ত- কোনটা ঠিক?
উত্তর: আপনি যা আদায় করছেন, সেটাই ঠিক।

প্রশ্ন : আমি কয় রাকা’ত পড়ি, তাইতো বলিনি!
উত্তর: ৮/২০ রাকা’ত যাই পড়ছেন, তাই ঠিক।

প্রশ্ন : এটা কী কথা? দুটো ঠিক হয় কিভাবে?
উত্তর: এটাই নিরেট সত্যি কথা, দুটোই সহীহ।

প্রশ্ন : আচ্ছা মানছি! তবু কোনটা বেশি সহীহ?
উত্তর: দুটোর উৎসমূল অভিন্ন, দুটোই সহীহ!

প্রশ্ন : নবী(সা:) ক’ রাকা’ত তারাওয়ীহ পড়তেন?
উত্তর: কত রাকা’ত পড়তেন- এটা জানার আগে এটাও জানা জরুরি- নবী(সা:)এর জীবদ্দশায় তারাওয়ীহ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল কি না।

প্রশ্ন : কী বলেন! রসূল(সা:) রমাদ্বানে পরপর তিন রাত জামাতসহ সালাত আদায় করেছেন- এই মর্মে বুখারিতে হাদিস নেই?
উত্তর: হ্যাঁ, অবশ্যই এই প্রসঙ্গে হাদিস আছে। সেই হাদিসে আরো বলা হয়েছে- রমাদ্বানের রাতের সেই নফল সালাতকে লোকেদের আগ্রহের কারণে ‘ফরজ’ করে দেওয়ার শঙ্কায় তিনি ‘তারাওয়ীহ’ ছেড়ে দেন, সাহাবীগণও আর সেই সালাত আদায় করেননি (বুখারি:১০৫৮)। এতে আরেকটা বিষয়ও পরিষ্কার হলো- তারাওয়ীহ ফরজ/ওয়াজিব নয়, বরং নফল। সুতরাং ৮/২০-এর প্রশ্ন একেবারেই বেহুদা তর্ক। একেবারে ছেড়ে দিলেও গুণাহ নেই হয়তো, তবে রমাদ্বানের বিরাট বারাকাহ/সাওয়াব থেকে নিজেকে বঞ্চিত করা হবে। আল্লাহু আ’লাম।

প্রশ্ন : তবে কি তারাওয়ীহ ছেড়ে দিতে বলছেন?
উত্তর: মোটেই না। বরং রমাদ্বানের রাতে বেশি বেশি সালাত আদায়ের পরামর্শ দিচ্ছি। কেননা, যিনি রমাদ্বানের রাতে সাওয়াবের আশায় সালাত আদায় করবেন, আল্লাহ তার অতীতের সকল গুণাহসমূহ ক্ষমা করে দেবেন। (সূত্র- বুখারি:১৮৬৯)।

প্রশ্ন : তাহলে আবারো সেই একই প্রশ্ন- কত রাকা’ত আদায় করা বৈধ?
উত্তর: আবারো সেই একই উত্তর- আপনি যত রাকা’ত আদায় করেন, তত রাকা’ত-ই বৈধ।

প্রশ্ন : আমাদের দেশে ২০রাকা’ত আদায় হচ্ছে।
উত্তর: আপনিও ২০ রাকা’ত আদায় করেন।

প্রশ্ন : তাহলে তো বুঝা গেল- ২০রাকা’ত তারাওয়ীহ-ই বৈধ, ৮ রাকা’ত নিয়ে যা চলছে, এটা বাড়াবাড়ি।
উত্তর: না! এটাও ঠিক নয়। বরং ৮রাকা’তের বিপক্ষে যারা অবস্থান নিয়েছে, তারাও বাড়াবাড়ি করছে।

প্রশ্ন : কীভাবে? ৮এর পক্ষে প্রমাণ কী?
উত্তর: রসূল(সা:) রমাদ্বানে রাতে ৮ রাকা’ত সালাত আদায় করেছেন মর্মে সহীহ হাদিসে দলিল পাওয়া যায়। (বুখারি:১০৭৬)।

প্রশ্ন : তাহলে কী ২০ রাকা’ত ভুল?!
উত্তর: তা তো বলিনি!

প্রশ্ন : আপনি বলেননি বটে, কিন্তু ৮ রাকা’তের পক্ষে অবস্থান থেকে তো এটাই পরিষ্কার!
উত্তর: তাহলে আপনার ২০এর পক্ষে অবস্থান থেকে কি এটাও পরিষ্কার নয় যে- ৮ রাকা’ত ভুল? আফসোস, এখানেই তো আমাদের সবচেয়ে ভুল! যারা ২০রাকা’ত পড়ছে, তারা বলছে ৮রাকা’ত ভুল, যারা ৮রাকা’ত পড়ছে, তারা বলছে ২০রাকা’ত ভুল। আসল কথা হলো- যারা এই মনোভাব নিয়ে আছে, আসলে তারা উভয়েই ভুল। মূল সমস্যা হলো- যিনি যে আকিদায় বিশ্বাসী, তিনি মনে করেন তিনি ছাড়া অন্যরা সব গোমরাহি!

প্রশ্ন : আপনি বলতে চান, যারা যেভাবে আছেন, তাদেরকে সেই অবস্থার উপর ছেড়ে দিতে?
উত্তর: এটা আমি নই, কুরআন-সুন্নাহ বলছে।

প্রশ্ন : আচ্ছা বলেন তো, বর্তমানে প্রচলিত এই তারাওয়ীহ কি ভুল? আপনি কি জানেন, কিভাবে এই তারাওয়ীহ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে?
উত্তর: রমাদ্বানে রসূল(সা:) একাকী নফল সালাত আদায় করার সময় সাহাবীরা এসে পেছনে জামায়া’তবদ্ধ হতে থাকে। এভাবে একাধারে তিন রাত এই সালাত জামায়া’তে আদায় হয়। খবর পেয়ে ক্রমশ মুসল্লির সংখ্যা বাড়তে থাকে। সাহাবিদের আগ্রহের কারণে এই সালাতকে ফরজ করে দেয়া হয় কিনা- এই আশঙ্কায় রসূল(সা:) চতুর্থ রাতে আর ঘর ছেড়ে বের হননি, সাহাবীরাও সালাত আদায়ে বিরত থাকলেন। পরবর্তী বছরে রমাদ্বানের পূর্বেই নবী(সা:) মৃত্যুবরণ করলে বিষয়টা অমীমাংসিত রয়ে গেল। প্রথম খিলাফাতকালও সেভাবেই অতিক্রান্ত হলো। অত:পর ওমর(রা:) এর খিলাফাতকালে তিনি যখন দেখলেন যে রমাদ্বানের রাতে লোকজন বিভিন্ন স্থানে ছোট ছোট দলে সালাত আদায় করছে, তখনই তিনি তারাওয়ীহকে জামায়াতবদ্ধ করার উদ্যোগ নিলেন। (সূত্র- বুখারি:১৮৬৯)।

প্রশ্ন : তাহলে আপনিই বলেন, ওমর(রা:) ২০ রাকা’তের যে সিদ্ধান্ত দিয়ে গেছেন, তার ওপরে ৮রাকা’তের নতুন সিদ্ধান্ত দেয়ার মতো যোগ্য কোন মুযতাহিদ কি এই জামানায় আছে?
উত্তর: ওমর(রা:)-এর মতো যোগ্য তো দূর, তাঁর যোগ্যতার হাজার মাইলের মধ্যেও কেউ নেই; তাঁর সিদ্ধান্তের বাহিরে নতুন সিদ্ধান্ত দেয়ার কোনো অবকাশও নেই। কিন্তু, যদি এই বিষয়ে রসূল(সা:) থেকে প্রমাণিত কোনো দলিল পাওয়া যায়, তাহলে সে বিষয়ে নিষেধ করাও কি ঠিক?

প্রশ্ন : তাহলে এখন আমাদের কোনটা গ্রহণ করা উচিত?
উত্তর: সিদ্ধান্ত আপনাকেই নিতে হবে।

প্রশ্ন : মনে তো হচ্ছে- যিনি যেটায় অভ্যস্ত, তিনি সেটাতেই থাকতে পারেন, আবার ইচ্ছে করলে ৮/২০ যে কোনোটাই আদায় করতে পারেন। কোনো সমস্যা থাকলে আবার একেবারে ছেড়েও দিতে পারেন।
উত্তর: ঠিক তাই।

প্রশ্ন : আচ্ছা, কেউ যেমন ২০এর কম পড়তে পারেন, ইচ্ছে হলে তিনি ২০ রাকা’তের বেশি কি পড়তে পারেন না?
উত্তর: জামায়া’তে ২০ রাকাত বা তারচেয়ে কমের ব্যাপারে দলিল রয়েছে। তবে কেউ যদি আরো বেশি ইচ্ছে করে, তাহলে একাকি দুই দুই রাকা’ত করে যত ইচ্ছে সালাত আদায় করতে পারেন। (সূত্র: বুখারি:৯৩৩)।

প্রশ্ন : তার মানে তারাওয়ীহ’র সালাত আদায় করা একেবারেই ঐচ্ছিক, নফল?
উত্তর: হুম! আরো বিষয় আছে।

প্রশ্ন : কী?
উত্তর: আমরা যতটা গুরুত্ব দিয়ে তারাওয়ীহ’র জামায়া’তে হাজির হচ্ছি, ৮/২০ রাকা’ত ইস্যুতে বাড়াবাড়ি করছি, সারাবছর ফরজ সালাতের ব্যাপারে কি এভাবে গুরুত্ব দিচ্ছি? তাহলে এটা কি ফরজের অবমাননা নয়?

প্রশ্ন : তাইতো! নফল নিয়ে আমরা তো সত্যিই মারাত্মক ফিতনা করছি?!
উত্তর: অথচ আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে সম্প্রীতি রক্ষা করে চলার নির্দেশ দিয়ে বলেছেন- ফিতনা হত্যার চাইতেও জঘন্য অপরাধ। বরং ফিতনা না করে মুসলিম উম্মাহর মধ্যে ঐক্য বজায় রাখা ফরজ।

* * *
ইন্না-লিল্লা-হ!⁉
তাহলে এতকাল ধরে আমরা কী করছি?
নফলের জন্য ফিতনা-ফ্যাসাদে লিপ্ত হয়ে ফরজ লঙ্ঘণ করে যাচ্ছি?…

লেখক- এটিএম গোলাম ছারওয়ার হিরো, প্রভাষক, সোনাপুর ডিগ্রী কলেজ, নোয়াখালী।

এআর

Facebook Comments

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here