Home প্রান্তজনের কথা এক থলে বিস্কিট!

এক থলে বিস্কিট!

611

সাউদার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে সাড়ে পাঁচ বছর শিক্ষকতার কারণে বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলা বারে আমার ছাত্রছাত্রীরা আইনজীবী হিসাবে কাজ করে। ২০১৫ সালে উত্তরের জেলা ঠাকুরগাঁ থেকে বদলী হয়ে কক্সবাজারে ম্যাজিস্ট্রেট পদে যোগদান করি। কক্সবাজার জেলায় আমার অনেক ছাত্রছাত্রী ওকালতি করে। পেশাগত কারনে তাদের সাথে দুরত্ব বজায় রাখতাম। একদিন একজন শিক্ষানবীস আইনজীবী ছাত্র অনুমতি নিয়ে চেম্বারে দেখা করতে আসলো। সে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী। সে অনেক অনুনয় বিনয় করে তার বাসায় দাওয়াত খাওয়ার নিমন্ত্রণ দিল। তার বিনয়ী চোখ, শারীরিক ভাষা দেখে বুঝলাম আমি তার বাড়িতে গেলে সে খুবই খুশী হবে এবং তার সামাজিক মর্যাদা বাড়বে। ছাত্র হিসাবে তাকে আমি খুব স্নেহ করতাম।

আমার মন খুব চাচ্ছে তার বাড়ী যেতে কিন্তু বিচারক হিসাবে আমাকে কিছু বিধি নিষেধ মেনে চলতে হয়। তাকে বললাম, তোমার বাড়ীতে আমি অবশ্যই যাবো তবে তা এখন কোন ভাবেই সম্ভব নই। যেদিন আমার বদলী হবে কেবল সেদিনই তোমার বাড়ীতে আমি যেতে পারি অবশ্য ততদিন পরে তুমি যদি দাওয়াত দাও। সে খুবই মনোক্ষুন্ন হলো এই ভেবে,স্যার মাত্র যোগদান করলো, কখন স্যারের বদলী হবে তার কোন ঠিক ঠিকানা নাই। সে সালাম দিয়ে চলে গেলো। দীর্ঘদিন সে তার সিনিয়রের সাথে আমার কোর্টে আসতো। কখনো জামিন বা রিলিফ পেতো, কখনো আইনের ম্যারপ্যাঁচে বিফল মনে ফিরে যেতো। দিন মাস বছর পেরিয়ে প্রায় আড়াই বছর পরে আমার বদলীর আদেশ হয়।

খবর পেয়ে ছেলেটা আমার সাথে দেখা করতে আসলো এবং বললো স্যার এবার আমার বাড়ীতে আপনাকে যেতেই হবে। আমি বললাম ঠিক আছে যাবো। চার্জ বুঝিয়ে দিয়ে কক্সবাজার থেকে বদলীর প্রস্তুতি নিচ্ছি। একদিন হঠাৎ উখিয়া মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার ফোন দিয়ে বললো চলেন কোথাও থেকে বেড়িয়ে আসি। গুড়িগুড়ি বৃষ্টি হচ্ছিল। আমার সেই ছাত্রকে কল দিয়ে বললাম তোমার বাড়ীতে আসছি। সে খুব খুশি হয়ে ঠিকানা বলল। তাদের বাড়ী কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলার বৌদ্ধ পাড়ায়। জঙ্গলময় পাহাড়ী এলাকা, অনুন্নত। মোটর সাইকেলে চড়ে তাদের বাড়ীর পাশের বাজারে পৌঁছলাম। সে রিসিভ করতে আসলো। খালি হাতে যাওয়া কেমন দেখায়। দোকানদারকে বললাম ভাই দেড় দুইশ টাকার বিস্কিট দেন।

ছেলেটা তখনো আইনজীবী হয়নি। খুব সাদামাটা চলাফেরা। তাকে সাধারণ ঘরের সন্তান বলে মনে হতো। সিনিয়র কখনো দু-একশ টাকা হাত খরছ দিতেন। চেহারায় বনেদী বা অভিজাত পরিবারের সন্তান বলে মনে হয়নি। সব কিছু মিলিয়ে ভাবলাম হালকা কিছু হাতে করে নিলেই হবে। ১৮০ টাকার বিস্কিট হাতে নিয়ে তাদের বাড়ীর দিকে রওয়ানা দিলাম। মেঠো পথ ভাঙ্গাচোরা রাস্তা। বেশ বিরক্তি লাগছে এই ভেবে কেনো এলাম। হঠাৎ সে বললো স্যার এটা আমাদের বাড়ী। আমি তো থ। এ বাড়ী তার কিভাবে হয়। রাস্তা থেকে দেখা যায় বিশাল সুরম্য দালান। কিছুটা অপ্রস্তুত হলাম।

বাড়ীর ভিতরে প্রবেশ করলাম। বিশাল বিল্ডিং এর অসাধারণ শিল্পশৈলী দেখে যারপরনাই মুগ্ধ হলাম। তার বৃদ্ধ বাবা ঘরের ভিতরে নিয়ে গেলেন। সেকি মহা কারবার। শিল্পিত ঘর, আভিজাত্যের ছোঁয়া ঘরের কোণে কোণে। আরো বিস্ময় অপেক্ষা করছে। আলাপের এক পর্যায়ে ছেলেটা জানালো, তারা পাঁচ ভাই এক বোন। একজন জার্মানি, একজন অষ্ট্রেলিয়া, একজন কানাড়া এবং একজন দুবাই থাকে। বৃদ্ধা বাবা মা বিদেশে যেতে চাইনা বলে বাবা মা এবং বিশাল সম্পত্তি দেখাশুনার জন্য সে বাধ্য হয়ে দেশে থাকে। হাতে থাকা ছোট বিস্কিটের প্যাকেট কে কি করি বুঝতে পারছিনা। ইস যদি পথে ফেলে দিতে পারতাম। ইচ্ছে করছিলো কোথাও লুকিয়ে রাখি। ইজ্জত কা সওয়াল। এই অাভিজাত্যতায় এক থলে বিস্কিট কোন ভাবেই যায়না।

মনে পড়ে গেলো স্কুলে পড়া ছুটির দিনে গল্প। এক পর্যটক বিদেশে বেড়াতে যায়। প্রতিদিন এক হোটেলে নাস্তা করতো। ছোট এক বয় তাকে নাস্তা দিত। তার সাথে পরিচয়ের সুত্রধরে তাদের বাড়ীতে তিনি বেড়াতে যান। যাবার সময় হাতে করে কয়েকটা মিষ্টি নিয়ে যান এই ভেবে যে হোটেল বয়, গরীব মানুষ মিষ্টি পেলে তার পিতামাতা খুশি হবেন। কিন্তু হোটেল বয়ের বাড়ীতে গিয়ে তার চক্ষু চড়াক। একি বিশাল লন, সুরম্য দালান, অাভিজাত্যতায় ভরা বাড়ী। তিনি মিষ্টির প্যাকেট কোথাও লুকিয়ে ফেলার চেষ্টা করছেন। হোটেলবয়ের মা এগিয়ে এসে মিষ্টির প্যাকেট হাতে নিয়ে পর্যটকে ধন্যবাদ দিলেন। আলাপচারীতার এক পর্যায়ে হোটেলবয়ের বাবা বললো যে, বয়টির স্কুল বন্ধ, গ্রীষ্মের ছুটি। বসে না থেকে হোটেলে কাজ করে যা আয় হবে তা দিয়ে বয়টি ইউরোপে বেড়াতে যাবে। বাবা মা অতি ধনী কিন্তু তারা চায় বয়টি সাবলম্বী হোক। সম্বিৎ ফিরে পেলাম। ভালো কিছু হাতে করে না আনায় ভীষণ লজ্জা হচ্ছিল। আসলে ছেলেটিকে দেখে বুঝার কোন উপায় ছিলনা সে অভিজাত পরিবারের সন্তান।

দুপুরের খাওয়ারের আইটেম দেখে তাজ্জ্বব। এত খাবার। সব কিছু ঠিক আছে ভান করে বিদায় নিয়ে এলাম। বাস্তব জীবনের ছুটির দিনের স্মৃতি থেকে শিখলাম।

লেখক- শাহিন সিরাজ, সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট,  চাঁদপুর।

Facebook Comments